anomaly-scan-kake-bole

অ্যানোমালি স্ক্যান গর্ভকালীন অবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সবথেকে সাধারণ স্ক্যান। ১৮ থেকে ২০ সপ্তাহ সময়কালের মধ্যে এই স্ক্যান করা হয়। অ্যানোমালি স্ক্যানকে মধ্য-গর্ভ অবস্থার স্ক্যানও বলা হয়। এই স্ক্যানের মাধ্যমে মাকে এবং গর্ভস্থ শিশুকে পরীক্ষা করা যায়। ডাক্তাররা দেখে নেন শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিক কিনা এবং গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা)-এর গতিবিধির উপরে নজর রাখেন।

গর্ভাবস্থার প্রায় সব স্ক্যানই করা হয় তলপেট (অ্যাবডোমেন)-এর উপর থেকে। ডাক্তার তলপেটের উপর থকথকে জেলী লাগিয়ে দেন এবং তার উপর বৈদ্যুতিক সঙ্কেত যন্ত্র (ট্রান্সডিউসার)-এর মাধ্যমে সংকেত পাঠান এবং শিশুর ছবি দেখতে পান।

ট্রান্সডিউসার থেকে শব্দতরঙ্গ শিশুর শরীরের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে এবং কম্পিউটার পর্দায় ছবি তৈরী করে। ডাক্তার বিভিন্ন কোণ থেকে শব্দ তরঙ্গ পাঠিয়ে যতটা সম্ভব ভালোভাবে শিশুর শরীর সম্পর্কিত আবস্থান দেখে নেন। শিশুর অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং গঠন সম্বন্ধে পূর্ণাঙ্গ ছবি পেয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার সেগুলির মাপ নিয়ে নেন। ডাক্তার যদি মায়ের জরায়ুগ্রীবা সম্পর্কিত তথ্য পেতে চান তবে তিনি ট্রান্সভ্যাজাইন্যাল স্ক্যান করার কথা বলতে পারেন।

 

স্ক্যান করার সময়ে ডাক্তাররা কি খোঁজেন?

গর্ভকালীন অবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের সময়ে অ্যানোমালি স্ক্যান-এর মাধ্যমে ডাক্তাররা নীচের বিষয়গুলি দেখেনঃ

১। গর্ভাশয়ে কয়টি শিশুর আছে, তার সংখ্যা। কখনও কখনও গর্ভধারণের ২০ সপ্তাহের আগে পর্যন্ত যমজ সন্তান কে খুঁজে পাওয়া যায় না।

২। আপনার শিশুর মাথার গঠন ও আকৃতি। শিশুর মস্তিস্কে গলদ থাকলে এই পর্যায়ে বুঝতে পারার সম্ভবনা থাকে, যদিও এরকম ঘটনা খুবই কম ঘটে।

৩। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, শিশুর হৃদযন্ত্রের নিরীক্ষা। ডাক্তার হৃদযন্ত্রের চারটি প্রকোষ্ঠ দেখে নেন। উপরের দুটি প্রকোষ্ঠ এবং অলিন্দ (ATRIA) এবং নীচের দুটি প্রকোষ্ঠ এবং নিলয় (VENTRICLES) আয়তনে সমান হওয়া দরকার। প্রতিটি হৃদস্পন্দনের সাথে সাথে কপাটিকাগুলি খোলা এবং বন্ধ হওয়া দরকার। ডাক্তার প্রধান ধমনী এবং শিরাগুলিকেও দেখে নেন যেগুলি রক্ত প্রবাহকে হৃদপিন্ডে নিয়ে আসে বা হৃদপিন্ড থেকে সারা শরীরে নিয়ে যায়।

৪। শিশুর পাকস্থলীও পরীক্ষা করা হয়। কখনও কখনও শিশু যে জরায়ু মধ্যস্থ তরল (AMNIOTIC FLUID)-এর উপর শুয়ে আছে তার কিছু অংশ গিলে ফ্যালে, যা শিশুর পাকস্থলীতে কালো বুদবুদের মত দেখায়।

৫। ডাক্তার পরীক্ষা করে দেখে নেন যে শিশুর দুটি বৃক্ক (KIDNEY) আছে কিনা এবং তার মূত্রথলীতে (KIDNEY BLADDER) মূত্র বিনা বাধায় পৌঁছতে পারছে কিনা।

৬। শিশুর মুখও পরীক্ষা করা হয়, দেখা হয় তার ঠোঁট জোড়া কিনা। কখনও কখনও শিশুর মুখের মধ্যের তালু (টাকরা) আটকানো থাকলে বুঝতে পারা কঠিন হয়ে পড়ে।

৭। শিশুর মেরুদন্ড পরীক্ষা করা হয় উল্লম্ব ভাবে ও তির্যক ভাবে যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে সব হাড়গুলি সজ্জা স্বাভাবিক আছে।

৮। শিশুর তলপেটের উপরের আবরণ পরীক্ষা করে দেখা হয় যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই দেওয়াল ভিতরের সব প্রত্যঙ্গকে সামনের থেকে ঢেকে রেখেছে।

৯। কোন বিকলাঙ্গতা আছে কিনা দেখার জন্য ডাক্তার শিশুর হাত, পা, বাহু, পায়ের পাতা পরীক্ষা করে দেখেন।

উপরের বিস্তৃত পরীক্ষা করা ছাড়াও ডাক্তার নীচে দেওয়া বিষয়গুলি নজর করে দেখে নেনঃ

ক) গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা)

খ) নাভিরজ্জু (গর্ভাবস্থায় মা ও শিশুর সংযোগ-গ্রন্থি)

গ) গর্ভাশয় মধ্যস্থ তরল (AMNIOTIC FLUID)

গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা) গর্ভাশয়ের সামনে বা পিছিনে থাকতে পারে। এটা সাধারনতঃ গর্ভাশয় দেওয়ালের উপরের কাছাকাছি অংশে থাকে। গর্ভফুল নীচে নেমে এসে গর্ভাশয়ের উপরের অংশকে ঢেকে ফেলতে পারে। যদি গর্ভফুল গর্ভাশয়ের নীচে নেমে আসে তবে তার অবস্থান জানার জন্য ডাক্তার তৃতীয় ত্রৈমাসসিক সময়ে আর একটি স্ক্যানের কথা বলতে পারেন। সেই সময়ের আগে গর্ভফুল (প্ল্যাসেন্টা) জরায়ু থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা।

ডাক্তার নাভিরজ্জুর তিনটি রক্তনালিকা (দুটি শিরা এবং একটি একক ধমনী) ও পরীক্ষা করে দেখেন। ডাক্তারেরা গর্ভাশয় মধ্যস্থ তরল-এর পরিমাণ দেখে নেন এটা নিশ্চিত করার জন্য সে শিশু স্বাধীনভাবে নড়া চড়া করতে পারবে। স্ক্যানের মাধ্যমে ডাক্তার শিশুর শারীরিক প্রত্যঙ্গগুলি মেপে দেখেন এবং তার শারীরিক বৃদ্ধিও পরীক্ষা করে দেখেন। ডাক্তার মেপে দেখেনঃ

ক) মাথার পরিধি (এইচ.সি) এবং ব্যাস (মাথার খুলির কেন্দ্রীয় অংশ এবং উপরের অংশের মধ্যবর্তী ব্যাস বা বি.পি.ডি)

খ) তলপেটের পরিধি (এ.সি)

গ) ফিমার বা দাবনার হাড়ের দৈর্ঘ্য (এফ.এল)

 

কোন ঝুঁকি আছে কী?

বেশিরভাগ স্ক্যানেই দেখা যায় যে শিশু স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে এবং কোন সমস্যা হয় না।

যদি কোন সমস্যার সৃষ্টি হয় বা সন্দেহ দেখা দেয়, তবে ডাক্তার বুঝিয়ে দেবেন যে আপনাকে কি করতে হবে। কিন্তু সমস্ত স্ক্যান সবসময় সমস্যা চিনতে পারে না, এবং একটা সম্ভাবনা রয়ে যায় যে আপনার শিশু কোন শারীরিক সমস্যা নিয়ে জন্মাবে যা স্ক্যান ধরতে পারেনি। যদি আপানার স্ক্যান নির্দেশ করে যে কোন একটা সমস্যা থাকতে পারে, আপনাকে নিশ্চিত হওয়ার জন্য অন্য কোন পরীক্ষা করার কথা বলা হতে পারে।

ডাক্তার যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে সমস্ত স্ক্যান করে নেওয়া জরুরী। শুধু শিশুর জন্য নয়, মায়েদের জন্যেও এটি গর্ভকালীন অবস্থায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। যদি আপনার শিশুর বৃদ্ধিতে কোন সমস্যা থাকে তবে স্ক্যানের জন্য সময় নষ্ট না করে রোগ নির্ণয় করা যায় এবং চিকিৎসা্ করা যায়। এর ফলে সুস্থ সবল শিশু জন্মাতে পারে।

 

Leave a Reply

%d bloggers like this: