ফর্মূলা শিশু খাদ্যঃ সেই সমস্ত বিষয় যা মায়েদের জানা দরকার

 মায়ের বুকের দুধ না ফর্মূলা দুধ? সবার একই উত্তর, আর সেটি হল, “মায়ের বুকের দুধই শিশুর জন্য সেরা দুধ।” অবশ্যই আমরা একমত, কিন্তু বিষয়টি সব মায়েদের জন্য একক ভাবে প্রযোজ্য নয়। মায়ের বুকে কি পরিমাণ দুধ তৈরি হচ্ছে শুরুতেই সেটা ভাবতে হবে। হতে পারে যে, আপনার জীবনযাপনের ধরণ এই ভাবনার পরিপন্থী, এটা একটা মায়ের চিকিৎসা সংক্রান্ত শারীরিক জটিলতা হতে পারে বা হয়ত অন্য কিছু। সুতরাং এইসব অবস্থায় আপনি কি ফর্মূলা দুধকে বেছে নেবেন? নীচের সম্ভাবনাগুলোর কথা ভেবে দেখুন!

 

মায়ের বুকের দুধের থেকে ফর্মূলা দুধকে বেছে নেওয়ার সঠিক সময় কোনটি?

এমন অনেক অবস্থা আসতে পারে যখন ফর্মূলা দুধের প্রয়োজন হয়।। উদাহরণ হিসাবে, অনেক মায়ের শরীরে শিশুর প্রয়োজন মত দুধ উৎপন্ন হয় না আবার অন্য ক্ষেত্রে শিশুর মা খেয়াল করলেন যে তার শিশুর সঠিক বৃদ্ধি হচ্ছে না, এইরকম সময়ে বুকের দুধ খাওয়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ফর্মূলা দু্ধের ব্যবহার বাচ্চার বৃদ্ধির সহায়ক হতে পারে। অন্য জীবন যাপন পদ্ধতির বিষয় যা এড়ানো যায় না সেগুলিকেও উপেক্ষা করা ঠিক নয়। অনেক মাকে তাদের চাকরীর দাবী মেনে তাদের গর্ভস্থ অবস্থা শেষ হওয়ার অল্প কয়েকদিন পরেই কাজে যোগ দিতে হয়, সেই কারণে মায়েদের বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ানোর শক্তি ও সময়ে টান পড়ে। তাই এইসব ক্ষেত্রে ফর্মূলা দুধের ব্যবহার করাই শ্রেয়।

 

ফর্মূলা দুধ এবং মায়ের দুধের মধ্যে পুষ্টিযোগ্যতার পার্থক্য

ফর্মূলা দুধে শিশুর বিকাশের জন্য একই মৌলিক ও পুষ্টিকর উপাদান থাকে যা মায়ের দুধে পাওয়া যায় – কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ফ্যাট। যদিও দুটির মধ্যে প্রধান পার্থক্য এই যে বুকের দুধে অনেক রকম অ্যান্টিবডি থাকে যেগুলি সংক্রমণ, অসুস্থতা এবং শ্বাস প্রশ্বাসের সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে সেখানে ফর্মূলা দুধ অন্য কাজ করে। উদাহরণ স্বরূপ, লোহা সমৃদ্ধ ফর্মূলা সেইসব শিশুদের জন্য ভাল, যারা আংশিকভাবে মায়ের দুধ পান করে বা একেবারেই পান করে না। কিছু ফর্মূলাতে DHA এবং ARA ফ্যাটি আসিড সংযুক্ত থাকে যা মস্তিস্ক বিকাশ ও চোখের উন্নতিতে সাহায্য করে।

 

কোন ফর্মূলা ব্যবহার করতে হবে?

যেহেতু আজকাল বিভিন্ন কোম্পানীর ফর্মূলা দুধ বাজারে পাওয়া যায়, আপনার পক্ষে ডাক্তারের পরা্মর্শ নিয়ে জেনে নেওয়া ভাল যে কোন ব্রান্ডের ফর্মূলা শিশুর বৃদ্ধির জন্য উপকারী। যদিও শেষ পর্যন্ত এটা সম্পূর্ণভাবে আপনার শিশুর উপর নির্ভর করে।।

নিম্নলিখিত ধরণের ফর্মূলা পাওয়া যায়।

 

১। গোরুর দুধ ভিত্তিক ফর্মূলা

সমস্ত ফর্মূলার মধ্যে এটি সবচেয়ে বেশী পাওয়া যায় এবং এইধরণের দুধভিত্তিক ফর্মূলাগুলি লোহা সমৃদ্ধ, যা আপনার শিশুর পক্ষে জরুরী। যদিও আপনার এই ফর্মূলাগুলি তবেই ব্যবহার করা উচিত, যদি ডাক্তার অনুমতি দেন।

 

২। সয় (সয়াবিন) ভিত্তিক ফর্মূলা

কিছু শিশু ল্যাক্টোজ হজম করতে পারে না। তাদের জন্য এই ফর্মূলা কাজ করে। কিন্তু এটা দেখা গেছে যে যেই সব শিশুদের গোরুর দুধে অ্যালার্জি আছে, তারা প্রায়শঃ এই ধরণের ফর্মূলাতে ব্যবহৃত প্রোটিনেও অ্যালার্জিগ্রস্ত, অতএব এই ফর্মূলা তাদের জন্য ও উপকারি নয়।

 

৩। হাইপো-অ্যালার্জিনিক ফর্মূলা

এই ফর্মূলা সেইসব শিশুদের জন্য আদর্শ, যাদের সাধারণ ফর্মূলার মূল উপাদান ল্যাক্টোজ বা সয়া প্রোটিনে অ্যালার্জি আছে। এই ফর্মূলায় থাকা প্রোটিন হজম করা সহজ কারণ এগুলি খুব সরল প্রকৃতির হয় এবং ভঙ্গুর অবস্থায় থাকে।

 

৪। বিশেষভাবে তৈরি ফর্মূলা

এই ফর্মূলা বিশেষভাবে তৈরি করা হয় নির্ধারিত সময়ের আগে জন্মেছে এমন বাচ্চা এবং কম ওজন নিয়ে জন্মেছে এমন শিশুদের জন্য।

 

যেসব ফর্মূলা পাওয়া যায় তার সবগুলি মূলতঃ তিনটি ধরণের হয়ে থাকে।

১। গুড়ো যেগুলি জলে গুলে নিতে হয় এবং সবচেয়ে কম খরচ সাপেক্ষ হয়।

২। ঘণ দ্রবন, যা তরল এবং জলে গুলে পাতলা করে নিতে হয়।

৩। সরাসরি ব্যবহার করার বা খাওয়ানোর যোগ্য, যেগুলি সরাসরি বোতলে ঢেলে নেওয়া যায়। এইগুলির দাম বেশী, কিন্তু যখন আপনি বাচ্চার সঙ্গে বাইরে বা রাস্তাতে আছেন সেই সেই সময়গুলিতে ব্যবহার করা সুবিধাজনক।

 

কি ধরণের বোতল ব্যবহার করা উচিৎ?

আমরা জানি যে বোতল বিভিন্ন আকৃতির ও মাপের হয়, কাঁচ বা প্লাস্টিক নির্মিত হয় এবং পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বা একবার ব্যবহারের মত হয়ে থাকে। অনেক শিশু নির্দিষ্ট বিশেষ আকৃতির ও গঠনের বোতল পছন্দ করে যা আপনি খুঁজে দেখতে পারেন কিছু বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতল ব্যবহার করার পর।

শিশুর স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ, যা করা সহজ হবে যদি আপনি এমন বোতল শিশুর জন্য কেনেন যাতে “বী পি এ –মুক্ত” এই লেবেলটি লাগানো আছে, অর্থাৎ যাতে বিস্ফেনল-এ জাতীয় রাসায়নিক নেই, যা আপনার শিশুর স্বাস্থ্যে খুব খারাপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যদিও কাচের বোতল এমনিতেই “বী পি এ –মুক্ত”, কিন্তু এই বোতল ফেটে যেতে পারে বা ভেঙ্গে যেতে পারে, এবং সেইজন্য বার বার নজর রাখতে হয়।

 

কত সময় অন্তর আমাদের শিশুকে খাওয়ানো উচিত?

সাধারনভাবে তখনই শিশুকে খাওয়ান ঠিক যখন তার পায়/ক্ষিদে পেয়েছে বোঝা যায়।

বেশীরভাগ সদ্যোজাত যারা ফর্মূলা দুধ খায় তারা ২ থেক ৩ ঘন্টা অন্তর অন্তর খায়, এবং তারা যখন বড় হতে থাকে, অর্থাৎ যখন তাদের পেট কিছু বেশী খাবার ধরে রাখতে পারে, তখন স্বাভাবিকভাবে তারা ৩ থেকে ৪ ঘন্টা অন্তর খায়। যদি আপনার শিশুর ওজন স্বাভাবিকের থেকে কম থাকে, বা সে নিতান্ত সদ্যোজাত হয়, তাকে বেশীক্ষণ খাওয়ান এড়িয়ে যাবেন না, যদি তাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে খাওয়াতে হয় তবুও। এই সমস্ত ক্ষেত্রে আপনার ডাক্তারের সাহায্য নিতে ভুলবেন না।

 

শিশুকে কতটা পরিমাণে খাবার দেওয়া যায়?

প্রথম কয়েক সপ্তাহে শিশুর জন্য ২ থেকে ৩ আউন্সের বোতলে খাবার মেশান। পরে বাচ্চার ক্ষিদের গভীরতা বুঝে নিয়ে এই পরিমাণ বাড়িয়ে দিন।

আপনার পক্ষে এটাই স্বাভাবিক যে আপনি প্রথমে তাকে বুকের দুধ খাওয়াতে চেষ্টা করবেন কিন্তু ফর্মূলা দুধ এড় দারুণ বিকল্প যেহেতু এটি শুধুমাত্র মায়েদের স্বস্তি ও বিশ্রামই দেয় না, পরিবারের অন্য সদস্যরাও আপনার বাচ্চাকে খাওয়াতে সাহায্য করতে পারেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: