যে মায়েরা গৃহের কাজে বাড়িতে থাকেন তাঁরা বর্ণনা করছেন সারাদিন তাঁরা কি করেন

 

বেশীরভাগ মানুষ যখন ঘরের কাজে সারাদিন ব্যস্ত থাকা মায়েদের কথা ভাবেন, উল্লেখযোগ্য বিশেষ কিছুই তাঁরা খুঁজে পান না। সেটি বাস্তব সত্যও বটে; হয়ত আমাদের কাজটা পৃথিবীর আর সব কাজের মধ্যে খুব আকর্ষনীয় নয়; কিন্তু এটি খুব সহজ কাজও নয়। একজন নিজ গৃহের কাজে থাকা মা হিসাবে প্রায়ই এই প্রশ্নের সম্মুখীন হই, “আপনি সারাদিন ধরে কী কাজ করেন? শুধু শুধু ঘরে বসে বসে আপনি কি বিরক্ত বোধ করেন না?” ওহে আমার চিন্তাগ্রস্ত প্রতিবেশী, বিশ্বাস করুন সারাদিনে আমার সময় কোথায় যে বিরক্ত হব??

সুতরাং, এইসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেয়ে একজন গৃহকাজে ব্যস্ত থাকা মা হিসাবে সারাদিনে আমার কাজের রুটিন বলে দিলে সমস্ত সংশয় চিরকালের জন্য দূর হয়ে যাবে।

দেখুন আমার দিন সংসারের বেশীর ভাগ মানুষের মত সকাল সাতটায় অ্যালার্ম বাজার পর থেকে শুরু হয় না। বরং আমার সাড়ে সাত মাস বয়সের হামাগুড়ি দেওয়া শিশু আরভের কান্নার শব্দে সকাল সাড়ে ছটায় বা সাতটায় আমার দিন শুরু হয়। তার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ার পর আমি তাকে ঠান্ডা করি এবং খাওয়াই; তাকে বিছানায় নিয়ে আসি এবং লক্ষে রাখতে থাকি কখন সে তার সঙ্গে খেলার জন্য বাবাকে জাগিয়ে দেয়। এরপর করণ, আমার স্বামী, তাকে ব্যস্ত রাখে, আর সেই ফাঁকে আমি দাঁত মেজে নিই এবং দিনের শুরুর জন্য নিজেকে তৈরি হয়ে নিই।

এরপর আমি আরভকে নিয়ে লিভিং রুমে চলে আসি, এবং খেলনা সহ তাকে মেঝেতে বসিয়ে দিই যাতে কাগজ পড়তে পড়তে করণ ওর উপরে নজর রাখতে পারে। ফলে আমি সময় পেয়ে যাই পরিবারের সবার জন্য দ্রুত কিছু প্রাতঃরাশের ব্যবস্থা করে নিতে। এরপর আমার সমস্ত কাজ নিখুঁত ভাবে করার জন্য আমি আমার সারাদিনের কাজের একটা সম্ভাব্য তালিকা বানাই এবং ফ্রীজের গায়ে সেই তালিকাটি সেঁটে দিই। আমি সম্ভাব্য কথাটি বললাম কারণ এই ছোট্ট বাচ্চাকে নিয়ে আগে থেকে কাজের পরিকল্পনা করা থাকলেও বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই সেটা মিলিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। সকাল আটটা নাগাদ করণ কাজে বেরিয়ে যায় এবং তখন বাড়িতে শুধু আমি আর আমার ছেলে।

এরপর প্রাতঃরাশের সময়। আমি আরভকে খাওয়ানোর জন্য উঁচু চেয়ারে বসিয়ে দিই। এই সময় আমি সাধারাণতঃ ছেলেকে রাগী এবং নরম করা থেঁতো ফল খেতে দিই। ছেলে কলা খেতে ভালবাসে। সময় বাঁচানোর জন্য ওকে খাওয়াতে খাওয়াতে আমিও খেয়ে নিই। হ্যাঁ, আপনি যখন মা হবেন এই ছোট্ট কৌশল আপনাকেও শিখে নিতে হবে। এরপর ওকে পরিস্কার করে দিয়ে আমি আবার বসিয়ে দিই মেঝেতে ওর ছোট্ট খেলার ম্যাটের উপর এবং ওর সব খেলনা বের করে দিই। তারপর আমি ওর সঙ্গে খেলা করে নিই কিছুটা সময় বা আমি ক্লান্ত হওয়া পর্যন্ত। তারপর ওকে নিয়ে ওর বিছানায় চলে যাই এবং ওর জন্য কিছু গল্প কবিতা পড়ি।

এরপর আমি আরভকে উঁচু চেয়ারে বসিয়ে দিই বা ওকে আরও কিছুক্ষণ খেলতে দিই এবং কাচার জন্য জমা হওয়া সারাদিনের কাপড় চোপড়ের স্তুপ নিয়ে বসি। এই সময় সাধারনতঃ চারিদিকে কি ঘটছে সে ব্যপারে সচেতন থাকার চেষ্টায় আমি খবর শুনি বা নিজেকে উজ্জীবিত রাখার জন্য মাঝে মাঝে গানের চ্যানেলগুলো খুলে দিই। এই করতে গিয়ে আমি অনেকবারই টিভি রিমোট ওয়াশিং মেশিনের কাছে ছেড়ে যাই, তবে এর জন্য কোন আক্ষেপ করার দরকারই নেই।

এরপর আমার দিনের সবথেকে মজার সময় – স্নানের সময়। আমার ছেলে, আমারই মত, স্নান করতে খুব ভালবাসে। আমি ওকে একটা ছোট্ট টাবে বসিয়ে দিই, ও নিজের খেলনা নিয়ে খেলতে থাকে আর আমি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ওর সঙ্গে বাচ্চাদের কথা থেকে শুরু করে সারা পৃথিবীর বিষয় নিয়ে বকবক করতে থাকি। কথনো কখনো আমার মনে হয় ও কি আমার কথার মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে পারে নাকি! হাসির বিষয় এই যে সেদিন যখন আমি ওর কাছে ট্রাম্পের অভিবাসী আইন নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করছি, ও তখন যেন সম্মতি দেওয়ার মত করে মাথা নেড়ে উঠল। তারপর আরভকে আমি জামাকাপড় পরিয়ে দিই এবং ও সকালের ঘুমটা সেরে নেয়। ঠিক এইসময় দৈনন্দিন কাজের যতগুলো সম্ভব সেগুলি আমি সেরে ফেলি। আমি ঘর দ্বোর ধোয়া মোছা করি, আরভের খেলনা গুছিয়ে রাখি, দুপুরের খাবার তৈরি করি এবং সুযোগ থাকলে বাগানের কাজ কিছুটা দেখাশোনা করি। সেখান থেকে কিছু ভেষজ তুলে নিয়ে নিজের জন্য সুন্দর করে গরম এক কাপ চা তৈরি করি।

এই কয়েক মিনিটের পূনরুজ্জীবন বেশ অনেকক্ষণ আমাকে সতেজ রাখে। এই সময়ের মধ্যে আমার পরম আদরের ছেলে উঠে পড়বেন এবং আমার এইমাত্র করা সমস্ত গোছগাছকে এলোমেলো করে দেবেন।

দুপুরের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর আমি ছেলেকে ঘুম পাড়িয়ে দিই। এটি তার দিনেরবেলার সব থেকে লম্বা ঘুম। অর্থাৎ, এই সময়ে আমি কিছু কাজ করে নেওয়ার অবসর পাই। আমি তখন আমার টেবিলে বসি এবং কিছু অসম্পূর্ণ কাজ ধরে ফেলি, আমার ই-মেল গুলো দেখতে থাকি এবং এক কাপ কফি নিয়ে বসে আমার ব্লগ লিখতে শুরু করি। যখনই ছেলে উঠে পড়ে, আমাদের বাইরে যাওয়া নিশ্চিত, তা যদি একটু পায়চারী করা হয়, তাও সই। অন্যান্য সময়ে আমরা পার্কে যাই বা যদি তার মেজাজ ভালো থাকে তবে আমরা মুদীর কেনাকাটা করতেও যাই। নাহলে আমি মুদির জিনিস বাড়িতেই অর্ডারে আনিয়ে নিই। দোকানে ঘ্যানঘ্যানে বাচ্চাকে নিয়ে গেলে যেসব ভয়ংকর চাহনি সহ্য করতে হয়, তার হাত থেকে আমায় রক্ষা কর বাবা!

এরপর আমরা বাড়ি ফিরলে আমি রাত্রের খাবার তৈরি করতে থাকি আর সে কিছু সময় খেলতে থাকে। রাতের খাওয়া হয়ে যাওয়ার পর আমি সাড়ে আটটার কাছাকাছি সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করি ও ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিই। তারপর আমার স্বামীর সাথে কিছু সময় কাটাই এবং এইভাবেই আমার দিন শেষ হয়।

সুতরাং দেখতে পেলেন যে আমার একঘেয়ে দিন ততটা বিরক্তিকর নয়। যাই হোক না কেন, আমি অন্য কোন কিছুর বিনিময়ে এই দিনপঞ্জী ছেড়ে দিতে রাজী নই। তবে আমি কোনো ধারণার ঠিক ভুল বিচার করতে চাই না। কর্মজীবি মায়েদের প্রতি কোন বিদ্বেষ না রেখে আমি একটা কথাই বলতে চাই – আপনার যা করতে ভালো লাগে আপনি তাই করুন। 

Leave a Reply

%d bloggers like this: